কেভিন মিটনিক – একজন বিশ্ব কুখ্যাত হ্যাকার এর গল্প!

কেভিন মিটনিক – একজন বিশ্ব কুখ্যাত হ্যাকার এর গল্প!

কেভিন মিটনিক নাম হয়তো এখন অনেকেই জানেন না। তবে এমন এক সময় ছিলো যখন আমেরিকাসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোও কেভিন সম্পর্কে বেশ ভালোভাবেই জানতো। তিনি আমেরিকায় বসে বসেই পৃথিবীর সেরা ব্ল্যাক হেট হ্যাকারের তালিকায় শীর্ষ স্থান অর্জন করেন। আমেরিকার ইতিহাসে এখনো তাকে সর্বকালের শেরা ব্ল্যাক হেট হ্যাকার হিসেবে জানা হয়। তার বিভিন্ন কর্মকান্ডের জন্য তাকে  আমেরিকার ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ হ্যাকার’ হিসেবে চিনহিত করা হয়।

তবে তিনি কী এমন করেছিলেন যার জন্য তাকে আদও সর্বকালের সবচেয়ে কুখ্যাত হ্যাকার হিসেবে জানা হয়? চলুন জেনে নেই এই ক্যাবিন মিটনিক এর সম্পর্কেঃ

কেভিন ডেভিড মিটনিক

ক্যাবিন মিটনিক একজন আমেরিকান বাসিন্দা। তিনি ১৯৬৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। কেবল ১২ বছর বয়সেই কেভিন রেডিও অপারেটিং কীভাবে করতে হয় তা শিখে যায়। এরপর তিনি স্যোশিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং করে হ্যাকিং শুরু করেন। স্যোশিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে এমন একটি ফিল্ড যেখানে কারও ভাবনা-কে ব্যবহার করে হ্যাকিং করা হয়। শুনে খুব আজব লাগছে, তাই না? 

আসলে স্যোশিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং হ্যাকিং এর এমন একটা ফিল্ড যেখানে মেশিন বদলে মনস্তাত্ত্বিক ম্যানিপুলেশন করে হ্যাকিং করা হয়। সহজ করে বোঝাতে হলে, আপনাকে ম্যানুপিলেট / ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্য হাতিয়ে নেওয়া।

খুব অল্প বয়সেই এই ফিল্ডে তিনি নিজেকে অনেক পারদর্শী করে তোলেন। বলা হয়ে থাকে যে ক্যাবিন তার হ্যাকিং জীবনের শুরু ডাম্পস্টার ডাইবিং থেকে করেন। ডাম্পস্টার ডাইভিং হলো বাণিজ্যিক, আবাসিক, শিল্প এবং নির্মাণ পাত্র থেকে তাদের মালিকদের দ্বারা ফেলে দেওয়া অব্যবহৃত কিন্তু ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী উদ্ধার করার কাজ। এই সামগ্রী যে কোনো কিছু হতে পারে যেমন কারও বা কোনো কোম্পানির ব্যক্তিগত তথ্য ইত্যাদি। 

এভাবে শুরুর দিনগুলোতে তিনি স্যোশিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং স্কিল ব্যবহার করে লস এঞ্জেলস বাসের পাঞ্চ কার্ড হ্যাকিং করে ফ্রীতে বাস ভ্রমণ থেকে শুরু করে টেলিফোন পাস-ও ফ্রীতে নিয়ে নিতেন। শুরুর দিনগুলোতে একজন সাধারণ হ্যাকার হলেও, ১৯৮৩ সাল থেকে কেবিন তার জীবনে হ্যাকিং নিয়ে আরও সিরিয়াস হয়ে পরে। এরপর সময়ের সাথে তিনি দেশের জন্য একটা হুমকি স্বরুপ হয়ে উঠেন। 

কেনো হ্যাকিং জগতে কুখ্যাত

১৯৭৯ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে একসময় ক্যাবিনের এক বন্ধু তাকে আর্পানেট-এর একটি নাম্বার দেয়। তখন সেই ফোন নাম্বার বায়পাস করে আরপানেটে অ্যাকসেস পেয়ে যায় মিটনিক। তখন আরপানেট মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয় দ্বারা ব্যবহৃত একটি নেটওয়ার্ক ছিল। আর যেহেতু এতো বড়ো একটি সিস্টেম হ্যাক করে ফেলে, সেহেতু মন্ত্রনালয়ের সকল স্পর্শকাতর ফাইল দেখার সুযোগ পেয়ে যান কেভিন। 

( তখনকার সময়ে আর্ক এমন একটা ডিজিটাল সিস্টেম ছিলো যার মাধ্যমে টেলিফোনে কোম্পানিগুলো চলতো। তো, কেবিন সেই নাম্বারটি বায়পাস করে আর্ক এর সফটওয়্যার ডাওনলোড করার চেষ্টা চালায়। পরবর্তীতে এর জন্য তাকে শাস্তির মুখোমুখিও হতে হয়। )

১৯৮৮ সালে এমনই এক টেলিকম কোম্পানি ডিজিটাল ইকুইপমেন্ট সিস্টেম (ডিইসি) হ্যাক করে তাদের সকল গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যার কপি করার দায়ে কেভিন-কে ১২ মাসের / ১বছর জেল খাটতে হয়। তবে সেই সময় তাকে এই শাস্তি হ্যকিং এর জন্য না দিয়ে বরং সাধারণ চুরির মামলা হিসেবে দেওয়া হয়। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর কেবিনের উপর আর একটি হ্যাকিং-এর অভিযোগে এরেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু হলে সে প্রায় আড়াই বছরের জন্য পালাতক হয়ে থাকেন। একজন ইলিগ্যাল হ্যাকার হওয়ার পাশাপাশি হটাৎ গায়েব হয়ে যাওয়ায় ক্যাবিনের উপর নিত্যনতুন হ্যাকিং রিলেটেড আরোপ যুক্ত হয়।

জানা যায় যে ক্যাবিন বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করে লুকিয়ে বিভিন্ন কম্পিউটারের নেটওয়ার্ক পরিবর্তনসহ প্রাইভেট ইমেইল-ও অবৈধভাবে হ্যাক করে নিতো। সে প্রতিবার ফোনের কপি বানিয়েই যোগাযোগ স্থাপন করতো। এতে করে তার আইপি কখনো কেও ট্রেক করতে পারে নি। সে সর্বমোট ২৩টি ফোনকল এবং বিশ হাজার ক্রেডিট কার্ড জাল করেন। তিনিত চাইলেই যেকোন সময় বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ করতে পারতেন। এভাবে তিনি নোকিয়া, মটোরোলা ও এনইসির মতো কোম্পানিগুলোর অনেক ক্ষতি করেন।

এরপর একদিন ক্যাবিন মিটনিক-কে তার হোটেল রুম থেকে এফবিআই দ্বারা গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের সময় তার রুম থেকে ১০০টি ক্লোন মোবাইল জব্দ করা হয়। ক্লোন মোবাইল বাদেও তার কাছ থেকে বিভিন্ন টেলিফোন ও কম্পিউটার কোম্পানির সফটওয়্যারের কপি সহ বিভিন্ন কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড পাওয়া যায়।

প্রত্যেকটি ফোনকলের জন্য তাকে প্রায় ৪৬০ বছরের জন্য কারাদন্ডের শাস্তি প্রদান করা হর।  অবশেষে, ২০০০ সালে ( ৩ বছর মেয়াদি কোনো কম্পিউটার, সেল ফোন এবং ইন্টারনেটযুক্ত ডিভাইস ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা) শর্ত দিয়ে কেভিনকে শাস্তি থেকে মুক্ত করা হয়। এছাড়াও তার শাস্তিতে আরোও শাস্তি যোগ করা হয়েছিলো।

মুলত পৃথিবীর সকল হ্যাকারদের মনে ভয় ও একটি উদাহরণ তৈরি করতে চেয়েছিলেন আদালত। তাই তাকে তার বিরুদ্ধে পেশ করা প্রমাণগুলোর বিরুদ্ধে রিভিউ করার সুযোগও দেওয়া হয় নি। এমন শাস্তি আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম ঘটতে চলেছিলো তাই এ নিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের মাঝে হইচই-ও ছিলো অনেক। এ নিয়ে তখন ‘ফ্রি কেভিন’ মুভমেন্ট শুরু হয়।

তাই আদালতে তার বিরুদ্ধের সমগ্র অভিযোগ রিভিও করা হয় এবং তাকে ৫ বছরের কারাদন্ড সহ ৩ বছরের জন্য কোনো প্রকার ইলেক্ট্রিক ডিভাইস ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। এছাড়াও, জরিমানাস্বরুপ তার শাস্তি তিনশ’ মিলিয়ন-এর বদলে ৪,১২৫ ডলার নির্ধারণ করা হয়।

তার জীবন-কথা এতটাই পরিচিতি লাভ করে যে ২,০০০ সালে তার উপর একটি সিনেমা তৈরি হয় যার নাম হলো “ট্রেকডাওন”।

বর্তমান অবস্থা

হ্যাকিং থেকে বিরত থাকা – ৩ বছরের নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর মিটনিক আবারো হ্যাকিং জগতে ফিরে আসেন। তবে এবার সে বৈধভাবে কাজ শুরু করেন। সে বিভিন্ন কোম্পানির সিস্টেম হ্যাক করে দুর্বল পয়েন্ট ধরিয়ে দেওয়ার কাজ করেন। এছাড়াও কীভাবে সিস্টেম প্রোগ্রামের দুর্বল পয়েন্টগুলো আরো শক্তিশালি করা যায় সে বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শও প্রদান করেন।

এমনকি হ্যাকিং এর প্রতি তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার জন্য ২০১৩ সালে ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কেভিন-কে ‘নেট লক’ ( তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান) কম্পিউটার সিস্টেমের নিরাপত্তা রক্ষার কাজে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

2004 সালে, তিনি মিটনিক সিকিউরিটি কনসাল্টিং নামে একটি নিজস্ব কোম্পানি স্থাপন করেন। এটির মাধ্যমে, তিনি এফবিআই সহ প্রায় ৫০০ সরকারী এবং বেসরকারী সংস্থার কর্মচারীদের এথিক্যাল হ্যাকিং শেখান এবং বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করেন। এছাড়াও তিনি তার হ্যাকিং রিলেটেড সমস্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উপর বই লিখেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.